নবাবী ছোঁয়া না থাকলেও ঐতিহ্যের তিনশো বছরের বেরা উৎসব আজও পালিত হয় নিয়ম মেনে।
Bengal icon news মুর্শিদাবাদ:শুধু উৎসব নয়, এ এক ইতিহাস। মুর্শিদাবাদের আনাচে কানাচে রয়েছে নবাবী আমলের ছোঁয়া, অনেক কিছুই যদিও বিলুপ্তপ্রায়। তবে প্রতি বছরের মতো এবারও ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ভাগীরথীর বুকে ভাসলো আলোর ভেলা।
মুর্শিদাবাদের এই উৎসবের আর এক নাম খাজা খিজির উৎসব। জলদেবতা খাজা খিজিরের স্মরণে এই উৎসবের সূচনা। কথিত আছে, নদীপথে পথ হারানো নাবিকদের পথ দেখাতেন খিজির। তাঁকে তুষ্ট করতেই নদীতে প্রদীপ ভাসানোর রীতি শুরু হয়। পরবর্তীতে এর সঙ্গে মিশে যায় বাঙালি হিন্দু সদাগরদের বাণিজ্যযাত্রার রীতিনীতি। তাই এই উৎসব হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রতীক।
উৎসবের বয়স প্রায় তিনশো বছর অতিক্রান্ত । ইতিহাস ঘাঁটলে দুটি মত পাওয়া যায়। এক মতে, ১৬৯০ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার সুবেদার মুকাররম খাঁ প্রথম এই উৎসব শুরু করেন ঢাকায়। ১৭০৪ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে সরিয়ে আনার পর এই উৎসব শুরু হয় হাজারদুয়ারীর ঘাটে।
তখন জৌলুস ছিল দেখার মতো। কলাগাছের ভেলার উপর বাঁশ, বাখারি ও চাটাই দিয়ে তৈরি হতো মিনার, তোরণ, গম্বুজ ও দুর্গের আদল। অভ্রের পাতের উপর আঁকা হতো কোরানের বাণী, মসজিদ ও নানা মূর্তি। রূপোর আচ্ছাদনে মোড়া ঝাড়লন্ঠন ঝোলানো হতো ভেলায়। সন্ধ্যা নামলেই গঙ্গার দুই পাড় আলোয় ঝলমল করে উঠত। চলত নাচ-গান ও আতসবাজির প্রদর্শনী। নবাব সভাসদদের নিয়ে তা উপভোগ করতেন।
এখনও সেই প্রথা মেনেই উৎসব হয়। মুর্শিদাবাদের জাফরগঞ্জ হল এই বেরা তৈরির প্রধান কেন্দ্র। বাঁশ ও কলাগাছ দিয়ে তৈরি হয় ভেলা। ইমামবাড়া থেকে হাতি ও কুমিরের মুখযুক্ত ঐতিহ্যবাহী নৌকা আনা হয় ওয়াসিফ মঞ্জিলে। প্রথা মেনে একটি সোনার প্রদীপ, পাঁচটি রূপোর প্রদীপ ও রঙিন কাগজের বাতি দিয়ে সাজানো হয় বেরা। তারপর রীতি মেনে ভেলার দড়ির বাঁধন কেটে দেওয়া হয়। ধীর গতিতে ভাগীরথীর বুকে ভেসে যায় আলোকমালা। যা দেখতে শ'য়ে শ'য়ে মানুষ ভিড় জমায় নদী তীরে।