যন্ত্রের পাশে পুজো পেল দেবশিল্পীর ‘বাহন’
জলদাপাড়ার পিলখানায় কুনকিদের ঘিরে অনন্য বিশ্বকর্মা বন্দনা
Bengal icon news,আলিপুরদুয়ার:কারখানায় যন্ত্রের পুজো হয়। গ্যারাজে সাজে গাড়ি। কোথাও পুজো পায় মেশিন, কোথাও কাজের সরঞ্জাম। কিন্তু জলদাপাড়ার জঙ্গলে বিশ্বকর্মা পুজোর ছবিটা একেবারেই অন্যরকম। সেখানে দেবশিল্পীর আরাধনায় যন্ত্রের পাশাপাশি পুজো পেলেন সেই প্রাণী, যাকে ঘিরেই বছরের পর বছর ধরে বনকর্মী ও মাহুতদের কর্মজীবন কুনকি হাতি।
বিশ্বকর্মা পুজোর সকালে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের বিভিন্ন পিলখানায় দেখা গেল এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। ধূপ-দীপ, ফুল, বেলপাতা, মন্ত্রোচ্চারণ আর আরতির মধ্য দিয়ে সাজিয়ে-গুছিয়ে পুজো করা হল বনদপ্তরের কুনকি হাতিদের। জলদাপাড়া পূর্ব রেঞ্জের পিলখানা থেকে পশ্চিম রেঞ্জের তোর্ষা ইস্ট কর্নার (টিইসি) বিট বিভিন্ন পিলখানাতেই এদিন ছিল উৎসবের আবহ।
ভোর হতেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। মাহুতরা নিজেদের হাতে কুনকিদের স্নান করান। শরীর পরিষ্কার করে ফুল ও বেলপাতায় সাজিয়ে তোলা হয় তাদের। তারপর পুজোর থালায় ধূপ, প্রদীপ, চাল, ফুলের সঙ্গে রাখা হয় হাতিদের প্রিয় খাবারও। কলার কাঁদি, বিভিন্ন ফল, আখ থেকে শুরু করে মিষ্টান্ন সবকিছুই সাজিয়ে দেওয়া হয় তাদের সামনে। মন্ত্রোচ্চারণ ও আরতির পর সেই প্রসাদও নিজেদের হাতে খাইয়ে দেন মাহুতরা।
বীর, জোনাকি, অনুসূয়া, রায়নার মতো কুনকিদের ঘিরে এদিনের আবেগ ছিল চোখে পড়ার মতো। মাহুতদের কাছে তারা শুধু বনদপ্তরের হাতি নয়। দিনের পর দিন জঙ্গলের পথে, বিপদের মুহূর্তে, কঠিন বনসুরক্ষার কাজে এই প্রাণীগুলিই তাঁদের সঙ্গী। ফলে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন কুনকিদের সামনে মাথা নোয়ানোর মধ্যে রয়েছে কর্মজীবনের এক গভীর সম্পর্কের প্রকাশ।
কুনকি হাতির গুরুত্ব কেবল আবেগের জায়গাতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশিক্ষিত কুনকি ও মাহুতরা বনসুরক্ষা, বন্যপ্রাণীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বিপদগ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত মোকাবিলার মতো নানা কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জলদাপাড়াতেও কুনকি হাতিদের সেই ভূমিকার একাধিক নজির রয়েছে। ২০২৫ সালের ভয়াবহ বন্যায় তোর্ষা ও মালঙ্গী নদীর জলে আটকে পড়া পাঁচটি কুনকি হাতিকে উদ্ধার করেছিলেন দুই মাহুত। সেই কাজের স্বীকৃতিতে তাঁরা গজ গৌরব পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হন।
তাই জলদাপাড়ার পিলখানায় বিশ্বকর্মা পুজোর এই আয়োজন নিছক একটি ধর্মীয় আচার নয়। কারও কাছে যে প্রাণী কর্মক্ষেত্রের সহচর, কারও কাছে যে প্রাণী বিপদের দিনে ভরসা সেই কুনকিদের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর জন্যই এদিন প্রার্থনা করলেন মাহুতরা।
আধুনিক যন্ত্রের যুগে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি ও মানুষের এই সম্পর্ক যেন অন্য এক বার্তা দিল। বিশ্বকর্মার পুজোয় শুধু লোহা, ইস্পাত কিংবা যন্ত্র নয় জলদাপাড়ায় সম্মান পেল জীবন্ত ‘কর্মসঙ্গী’। জঙ্গলের নীরবতার মধ্যে ধূপের গন্ধ, মন্ত্রের ধ্বনি আর কুনকিদের শান্ত উপস্থিতি মিলিয়ে তৈরি হল এক বিরল দৃশ্য। এমন দৃশ্য, যেখানে দেবশিল্পীর আরাধনায় তাঁর প্রতীকী ‘বাহন’ই হয়ে উঠল পুজোর কেন্দ্রবিন্দু।