বর্ষায় বেহাল জাতীয় সড়ক, দুর্ভোগে আমজনতা
গর্জি রেলস্টেশনের মুখে ৮ নম্বর জাতীয় সড়কের করুণ দশা, বারবার জোড়াতালি দিয়েও মিলছে না স্থায়ী সমাধান
আষাঢ় ও শ্রাবণ—এই দুই মাস বর্ষাকাল। আর বর্ষা নামতেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের রাস্তাঘাটের বেহাল দশা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। তবে এবার যে রাস্তার চিত্র সামনে এসেছে, সেটি কোনও পাড়া বা গলির রাস্তা নয়; খোদ আগরতলা-সাবরুম জাতীয় সড়ক, অর্থাৎ ৮ নম্বর জাতীয় সড়কের একাংশের এমন করুণ দশা যে, তা দেখলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে।
গোমতী জেলার গর্জি ফাঁড়ি থানার অন্তর্গত গর্জি রেলস্টেশনের মুখে জাতীয় সড়কের বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বর্ষার জলে সেই গর্তগুলোতে জল জমে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ক দিয়ে হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। শুধু সাধারণ মানুষই নন, বিভিন্ন সময়ে নেতা, মন্ত্রী, আমলা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও এই সড়ক ব্যবহার করেন। তারপরও দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার এমন বেহাল দশা কেন—এই প্রশ্নই এখন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে নিত্যযাত্রী ও যানবাহনের চালকেরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার এই দুরবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় কিংবা বৃষ্টির সময় গর্তগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়ায় দূর থেকে সেগুলো বোঝা যায় না। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
কয়েকদিন আগেই গর্জি রেলস্টেশনের মুখে এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্কুটি নিয়ে চলাচলের সময় রাস্তায় পড়ে যান বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনায় তাঁর হাত, পা ও মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। স্থানীয়দের দাবি, এ ধরনের ছোট-বড় দুর্ঘটনা এই এলাকায় প্রায়ই ঘটছে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সগুলিকে। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতের সময় যখন অ্যাম্বুলেন্সে করে গর্ভবতী মহিলা বা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন রাস্তার গর্ত ও জলকাদার কারণে তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। একদিকে রোগীর শারীরিক সমস্যা, অন্যদিকে বেহাল রাস্তার ঝাঁকুনি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
এদিকে রাস্তার বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় আজ জাতীয় সড়কের গর্ত মেরামতের কাজে কয়েকজন শ্রমিককে দেখা যায়। তাঁরা গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা স্টোন চিপস পুনরায় গর্তের মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও জল জমে থাকা গর্তের মধ্যেই বালি ও সিমেন্টের মিশ্রণ ঢেলে মেরামতের কাজ করতে দেখা যায়।
তবে এই মেরামত ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এভাবে জল জমে থাকা গর্তের মধ্যে স্টোন চিপস, বালি ও সিমেন্ট দিয়ে করা মেরামত কতদিন টিকবে?
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ১৫ দিন অন্তর অন্তর গর্জি ফাঁড়ি থানার কাছাকাছি অথবা গর্জি রেলস্টেশনের মুখে একইভাবে রাস্তার মেরামত করতে দেখা যায়। কখনও ড্রজার দিয়ে পুরনো স্টোন চিপস তুলে ফেলা হয়, আবার নতুন করে রাস্তা মেরামত করা হয়। কিন্তু অভিযোগ, সেই মেরামতের কয়েকদিনের মধ্যেই ফের রাস্তার পিচ ও মেরামতের সামগ্রী উঠে গিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে আসে সড়কটি।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—বারবার জোড়াতালি দিয়ে মেরামত না করে কি এবার স্থায়ীভাবে রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া যায় না?
জাতীয় সড়ক ব্যবহারকারী যানবাহনের চালকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই জাতীয় সড়কের বেহাল অংশগুলি দ্রুত চিহ্নিত করে টেকসই ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার করা হোক।
অনেকেরই অভিযোগ, নেতা-মন্ত্রী ও আমলারা সাধারণত উন্নতমানের সরকারি বা ভিআইপি গাড়িতে যাতায়াত করেন। তাই রাস্তার গর্তের ঝাঁকুনি তাঁদের চলাচলে সাধারণ মানুষের মতো প্রকটভাবে অনুভূত হয় না। কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নিজেদের গাড়ি, বাইক, অটো কিংবা অন্যান্য যানবাহনে এই রাস্তা ব্যবহার করেন। ফলে রাস্তার প্রকৃত দুর্ভোগ তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, ৮ নম্বর জাতীয় সড়ক শুধু একটি রাস্তা নয়; আগরতলা থেকে সাবরুম পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই রাস্তার উপর নির্ভর করে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ, ব্যবসায়ী, রোগী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবী যাতায়াত করেন।
তাই সাধারণ মানুষের দাবি, সাময়িকভাবে গর্তে সামগ্রী ফেলে মেরামত নয়, বরং রাস্তার বেহাল অংশের স্থায়ী সংস্কারের ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে নিয়মিতভাবে রাস্তার গুণমান ও মেরামতকাজের তদারকি করারও দাবি উঠেছে।
এখন দেখার বিষয়, গর্জি রেলস্টেশনের মুখে ৮ নম্বর জাতীয় সড়কের এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রশাসন কবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আগরতলা থেকে সাবরুম পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ক নিয়ে সরকার দ্রুত নজর দেবে—এই প্রত্যাশাতেই এখন তাকিয়ে সাধারণ মানুষ।