*দশভুজা নন, অসুরও নেই—অভয়া রূপে পূজিতা মা, শিবপুরের পালবাড়ির পুজোয় আজও বেঁচে ৩৫৫ বছরের ইতিহাস*
Bengal icon news হাওড়া: দেবীর হাতে দশটি অস্ত্র নেই। নেই অসুর বধের দৃশ্যও। দুই হাত তুলে তিনি যেন অভয় দেন তাঁর আপনজনদের। পাশে এক চালায় লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। দেবী এখানে মহিষাসুরমর্দিনী নন, তিনি ‘অভয়া’। হাওড়ার শিবপুরের পালবাড়ির দুর্গাপুজোর এই স্বাতন্ত্র্যই তাকে অন্য বনেদি বাড়ির পুজোর থেকে আলাদা করে চেনায়। এবার সেই পুজো পা দিল ৩৫৫ বছরে। সময় বদলেছে, বদলেছে চারপাশের পুজোর জৌলুস, কিন্তু পালবাড়ির ঠাকুরদালানে আজও টিকে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর লোকাচার, বিশ্বাস আর পারিবারিক আবেগ। হাওড়ার অন্যতম প্রাচীন এই পুজোর সূচনা করেছিলেন সর্বেশ্বর পাল। একসময় ধুমধাম করে পুজো হত। পরে সর্বেশ্বরবাবু পুজোর দায়িত্ব তুলে দেন বটকৃষ্ণ পালের হাতে। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাল পরিবারের সদস্যরাই মায়ের আরাধনা করে আসছেন। কথিত আছে, এই দেবী আসলে অসুরবিনাশী নন। তিনি ‘অভয়া’—ভক্তের ভয় হরণকারী মায়ের রূপ। কুমোরটুলির শিল্পী বংশপরম্পরায় এই বাড়ির প্রতিমা গড়ে আসছেন। শুধু মৃৎশিল্পী নন, ঢাকিরাও বংশের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বছরের পর বছর এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত। মহালয়ার পর থেকেই চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে শুরু হয় পুজোর আবহ। শুক্লা তিথিতে মায়ের বোধন। সপ্তমীতে কলাবউ বা নবপত্রিকার স্নান গঙ্গায় নয়, হয় বাড়ির অন্দরেই। কিন্তু এই পুজোর সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রাচীন লোকাচারগুলির একটি হল পশুবলি। সপ্তমীতেই মায়ের প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর পাঁঠাবলি হয়। অষ্টমীর পুজোয় অবশ্য বলির রীতি নেই। পরিবারের ৩০-৪০ জন মহিলা একসঙ্গে ধুনোপোড়ানোর পর হয় সন্ধিপুজো। সেই সময় রয়েছে পাঁঠাবলির প্রথা। নবমীর সকালে বাড়ির ভোগের সময় আরও একটি পাঁঠাবলি হয়। এরপর পাঁচটি ফলের বলি এবং সবশেষে মহিষ বলি। হ্যাঁ, ৩৫৫ বছরের পুরনো এই পুজোয় আজও মহিষ বলির রীতি চলে আসছে। বলি যাঁরা দেন তাঁরাই মহিষের দেহ নিয়ে যান। শুধু মাথাটি নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গায়। তবে পুজোর একেবারে শুরুর দিকে এই রীতি ছিল না। এর পিছনেও রয়েছে এক আশ্চর্য লোককথা। কথিত আছে, শিবপুরের রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজোয় পালবাড়ির দেবী ‘অভয়া’র বোন ‘মায়া’কে দুর্গারূপে পুজো করা হত। সেই রায়চৌধুরী বাড়িতে ছিল মহিষ বলির প্রথা। একবার নাকি সেখান থেকে একটি মহিষ হাঁড়িকাঠে মাথা দিয়ে শিবপুরের পালবাড়িতে চলে আসে। সেই ঘটনাকেই ঘিরে পরে পালবাড়িতে শুরু হয় মহিষ বলির রীতি। নবমীর পুজো শেষে মায়ের হোম ও দক্ষিণান্তর হয়। তারপর শুরু হয় বিসর্জনের প্রস্তুতি। দশমীতে বাড়ির মহিলারা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। কয়েক শতাব্দীর পুরনো এই পুজো আজ আগের মতো হয়তো জাঁকজমকপূর্ণ নয়। সময়ের সঙ্গে কমেছে জৌলুস, বেড়েছে আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার চাপ। তবু ঐতিহ্যের সঙ্গে আপস করেনি পরিবার। পুজোর খরচ চালাতে পরিবারের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছে একটি ট্রাস্ট। সেই তহবিলে সঞ্চিত অর্থ থেকেই হয় মায়ের পুজো। আজ যখন থিমের পুজোর রমরমা, তখনও পালবাড়ি আঁকড়ে ধরে রেখেছে পুরনো দিনের নিয়মকানুন। তাই শিবপুরের পালবাড়ির পুজো শুধু ৩৫৫ বছরের একটি সংখ্যা নয়। এটি এক পরিবারের শিকড়ের গল্প, হারিয়ে যেতে বসা লোকাচারের গল্প, পূর্বপুরুষের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে বর্তমান প্রজন্মের এগিয়ে চলার গল্প। ঝলমলে থিমের ভিড়ে যখন বদলে যাচ্ছে পুজোর চেনা চেহারা, তখনও পালবাড়ির ঠাকুরদালানে দুই হাত তুলে ‘অভয়া’ যেন বলে চলেছেন—সময় বদলাক, প্রজন্ম বদলাক, কিন্তু ঐতিহ্যের প্রদীপটি যেন নিভে না যায়।