
১০ বছর ধরে উত্তরাখণ্ডের রানীখেতের বরফাবৃত রাস্তা, মাজখালি আর ধারিখেতের বাজারে এক ভবঘুরে মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেন। স্থানীয় মানুষ তাঁকে দয়া করে খাবার বা জামাকাপড় দিলেও, তিনি আসলে কে বা তাঁর বাড়ি কোথায়—তা এক গভীর রহস্যের অন্ধকারে ঢাকা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনাটি যেন ওই এলাকার এক চেনা রুটিনে পরিণত হয়েছিল।
অবশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে মাজখালি পুলিশ চত্বরের নতুন দায়িত্ব নেন সাব-ইন্সপেক্টর বা এএসআই বিনোদ ফড়্ত্যাল। নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে ওই পথচারী ও অসহায় মানুষটির ওপর তাঁর নজর পড়ে। তিনি অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও বাড়ির ঠিকানা জানতে চান। কিন্তু মানসিক অসুস্থতার কারণে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলা সেই মানুষটির মুখ থেকে কোনো কথাই বের করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ পুলিশি তদন্তের গণ্ডিতে আটকে না থেকে বিনোদ ফড়্ত্যাল এক ব্যতিক্রমী ও সংবেদনশীল মানবিক উদ্যোগ নেন।
তিনি থানা থেকে একটি ডায়েরি ও কলম এনে ওই মানুষটির হাতে তুলে দিয়ে পরম মমতায় বলেন, "আপনার অতীতের বা স্মৃতির কথা যা কিঞ্চিৎ মনে পড়ে, সেটাই এই খাতায় লিখে দিন..."
প্রথমে বিভ্রান্ত হয়ে ডায়েরির পাতার দিকে তাকিয়ে থাকার পর, মানুষটি কাঁপতে কাঁপতে কলম তুলে নেন এবং পাতায় মাত্র একটি শব্দ লিখে ফেলেন— "রাজেপুর"।
এই একটিমাত্র লিখিত শব্দই যেন ১০ বছরের জমাট বাঁধা অন্ধকারের মাঝে আশার আলোর এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। পুলিশ এই সূত্র ধরে ভারতের বিভিন্নপ্রান্তে 'রাজেপুর' নামের এলাকার খোঁজ শুরু করে এবং উত্তরপ্রদেশের ফারুখাবাদ জেলার রাজেপুর থানায় ওই ব্যক্তির ছবি ও বিবরণ পাঠায়। এরপরে শুরু হয় একটানা চার দিনের তীব্র ও নিখুঁত অনুসন্ধান।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে খোঁজ মেলে ফারুখাবাদের রাজেপুর রাথৌড়ি গ্রামের। পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, ইনিই সেই শ্যাম সিং— যিনি আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে মানসিক অসুস্থতার কারণে হঠাৎ করেই ঘরছাড়া হয়েছিলেন।
২০২৬ সালের ৭ আগস্ট, যে পরিবারটি বছরের পর বছর ধরে বাবাকে তিল তিল করে খুঁজেও সমস্ত আশা নিভিয়ে ফেলেছিল, তারা উত্তরাখণ্ড পুলিশের কাছ থেকে এক অবিশ্বাস্য ও সুখের বার্তা পেল। খবর পাওয়া মাত্রই বুকভাঙ্গা আশা আর আনন্দাশ্রু নিয়ে তাঁর ছেলে ও স্বজনরা উত্তরাখণ্ডে ছুটে আসেন। মাজখালি থানায় দীর্ঘ ১০ বছর পর বাবাকে সামনে দেখতে পেয়ে তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
যাঁরা দায়িত্বকে কেবল চাকরির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্তরের মানবিকতা দিয়ে বিচার করেন, সেই এএসআই বিনোদ ফড়্ত্যাল এবং পুরো আলমোড়া পুলিশ প্রশাসনের এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা প্রমাণ করে দিয়েছে যে— সঠিক সদিচ্ছা থাকলে বহু পুরোনো অদৃশ্য দূরত্বও মুছে ফেলা সম্ভব। রানীখেতের রাজপথ আজ এক অনন্য মানবিক মিলনটানের সাক্ষী হয়ে রইল।
#Humanity #InspirationalStory #UttarakhandPolice #AlmoraPolice #EmotionalReunion #GoodNews #PoliceWithHeart #Ranikhet