ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদয়পুরের মাতাবাড়ি রামঠাকুর আশ্রম সংলগ্ন কল্যাণ সাগরের পূর্ব পাড়ে সমাপ্ত হলো তিন দিনব্যাপী বিশেষ ধর্মীয় উৎসব। ‘শ্রী মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী সিদ্ধ পীঠম ট্রাস্ট’-এর উদ্যোগে গত ১লা জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘ভূমি পূজা’ ও ‘শ্রী মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী সিদ্ধ পীঠম’ গুরুকূল প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
উৎসবে শুক্রবার সমাপনী দিনে এক ভক্তিঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এদিন সকাল থেকেই মূল আকর্ষণ ছিল ১০৮ কন্যাকুমারী পূজা। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে কন্যাকুমারীদের চরণ ধুয়ে এবং তাদের হাতে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী তুলে দিয়ে আশীর্বাদ নেন উপস্থিত অতিথিরা। কন্যাকুমারী পূজার এই পবিত্র পর্বে শামিল হন স্থানীয় বিধায়ক অভিষেক দেবরায়, শ্রী মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী সিদ্ধ পীঠম ট্রাস্টের প্রধান অধ্যক্ষ পূজ্য গুরুজি আচার্য শঙ্কর জী সহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা।
কন্যাকুমারী পূজার পর এক বর্ণাঢ্য ‘কলস যাত্রা’ অনুষ্ঠিত হয়। এই কলস যাত্রায় স্থানীয় মহিলাদের পাশাপাশি পা মেলান বিশিষ্ট সমাজসেবী সবিতা নাগ ও এলাকার জনপ্রতিনিধিরা। এরপর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও যজ্ঞের মধ্য দিয়ে ভূমি পূজার মূল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
দুপুরের পর প্রস্তাবিত গুরুকূল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিলান্যাস এবং ‘ধন্য মাণিক্য মুক্ত মঞ্চে’ এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়। এছাড়াও অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক অভিষেক দেবরায়, বিধায়ক জিতেন্দ্র মজুমদার, বিধায়কা কল্যাণী রায়, উদয়পুর পৌর পরিষদের চেয়ারম্যান শীতল চন্দ্র মজুমদার, গোমতী জেলা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি সুজন সেন এবং মাতাবাড়ি পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান শিল্পী দাস। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ট্রাস্টের প্রধান অধ্যক্ষ পূজ্য গুরুজি আচার্য শঙ্কর জী এবং ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ তথা সংস্কার ভারতীর চেয়ারম্যান ডঃ হেমলতা এস মোহন।
অনুষ্ঠান মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায় এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আমাদের সনাতন সংস্কৃতির বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করার ক্ষেত্রে এই গুরুকূল এক অনন্য ভূমিকা পালন করবে। ত্রিপুরার পর্যটন ও ধর্মীয় মানচিত্রে এই প্রকল্প এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ট্রাস্টের প্রধান অধ্যক্ষ পূজ্য গুরুজি আচার্য শঙ্কর জী বলেন, শ্রী মাতা ত্রিপুরাসুন্দরীর অশেষ কৃপায় মাতাবাড়ির পবিত্র ভূমিতে ‘শ্রী মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী সিদ্ধ পীঠম’-এর গুরুকুল প্রতিষ্ঠার ভূমি পূজা শুভ সূচনা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি শুধুমাত্র একটি আশ্রম নির্মাণ নয়; বরং সনাতন ধর্ম, সাধনা, সেবা, সংস্কার এবং ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণের এক সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। এই সিদ্ধ পীঠমকে এমন একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যেখানে ভক্তি, জ্ঞান, সেবা এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ একসূত্রে গাঁথা থাকবে। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ এখানে সমান মর্যাদা ও আন্তরিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।
ট্রাস্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পীঠম প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যগুলির মধ্যে রয়েছে— শ্রীবিদ্যা সাধনা ও দেবী উপাসনার কেন্দ্র গড়ে তোলা, বেদ-উপনিষদ ও শাস্ত্রচর্চার মাধ্যমে ভারতীয় জ্ঞান-পরম্পরার প্রসার, যুবসমাজের নৈতিক চরিত্র গঠন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মানবসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা, পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় করা।
গুরুজি আরো বলেন, “মায়ের কৃপা সকলের জন্য সমান”—এই আদর্শকে সামনে রেখে জাতি, জনজাতি, ভাষা, বর্ণ বা আর্থিক অবস্থার ভেদাভেদ ছাড়াই সকলকে সমান মর্যাদায় গ্রহণ করা হবে। বিশেষ করে জনজাতি সমাজের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও মাতৃশক্তির প্রতি তাদের ভক্তিকে সনাতন সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তিন দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সাধু-সন্ত, ভক্তমহল এবং সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সমাপনী দিনে গুরুকূল প্রতিষ্ঠার এই মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন উপস্থিত সকলেই।