রেল-বিমানের মতো স্বাস্থ্য পরিষেবাতেও ‘কানেক্টিং’ অ্যাম্বুলেন্স! বিলোনিয়া থেকে গোমতী, তারপর আগরতলা—উঠছে একাধিক প্রশ্ন
রেল কিংবা বিমান পরিষেবায় যাত্রীদের সুবিধার জন্য ‘কানেক্টিং সিস্টেম’-এর কথা আমরা শুনে থাকি। কিন্তু এবার একই ধরনের ‘কানেক্টিং সিস্টেম’-এর অভিযোগ উঠল রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাকে ঘিরে। শুনতে অবাক লাগলেও বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এমনই এক ঘটনার সাক্ষী থাকল গোমতী জেলা হাসপাতাল চত্বর।
ঘটনার সূত্রপাত বিলোনিয়া হাসপাতাল থেকে। জানা যায়, এক মহিলা রোগীর রক্তপাত বন্ধ না হওয়ায় তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আগরতলার এজিএমসি হাসপাতালে রেফার করা হয়। এরপর ১০২ নম্বরে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স বুক করা হয়। TR-01-H-2376 নম্বরের একটি ১০২ অ্যাম্বুলেন্সে করে বিলোনিয়া থেকে রোগীকে নিয়ে আসা হয় গোমতী জেলা হাসপাতাল চত্বরে।
কিন্তু গোমতী জেলা হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ঘটে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল ১০২ পরিষেবার আরও একটি অ্যাম্বুলেন্স। বিলোনিয়া থেকে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি গোমতী জেলা হাসপাতাল চত্বরে পৌঁছানোর পর এক অ্যাম্বুলেন্স থেকে অন্য অ্যাম্বুলেন্সে রোগীকে স্থানান্তর করা হয়। এরপর নতুন অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগীকে আগরতলার এজিএমসি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—এক জেলা থেকে অন্য জেলায় রোগী নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কেন মাঝপথে অ্যাম্বুলেন্স পরিবর্তন করতে হচ্ছে? যদি গাড়িতে কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা থাকে, তাহলে রোগীকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে না কেন?
গোমতী জেলা হাসপাতাল চত্বরে থাকা কয়েকজন সরকারি ও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকের দাবি, বিলোনিয়া থেকে আগত ১০২ পরিষেবার অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে এসে এভাবেই অন্য অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তরের ঘটনা নতুন নয়। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এক অ্যাম্বুলেন্স থেকে অন্য অ্যাম্বুলেন্সে রোগী স্থানান্তরের এই ব্যবস্থা চলে আসছে।
অন্যদিকে, অ্যাম্বুলেন্স চালকদের একাংশের দাবি, দক্ষিণ জেলা ও গোমতী জেলার ১০২ পরিষেবার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই ধরনের ‘কানেক্টিং’ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এর পেছনে আর্থিক অনিয়ম এবং জ্বালানি তেল সংক্রান্ত একটি চক্র থাকতে পারে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতের ঘটনায় আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স চালকের দাবি, তাঁর অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল না। এমনকি জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত সাইরেনের যন্ত্রও নষ্ট ছিল বলে অভিযোগ। তা সত্ত্বেও রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে বাধ্য করা হয় বলে দাবি চালকের।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাতের অন্ধকারে গোমতী জেলা হাসপাতাল চত্বরে এক অ্যাম্বুলেন্স থেকে অন্য অ্যাম্বুলেন্সে একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে স্থানান্তর করতে হয়েছে। এতে রোগীর পরিবার যেমন চরম হয়রানির মুখে পড়েছে, তেমনই অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কোনো অ্যাম্বুলেন্সে সত্যিই যদি প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত রোগীকে নিরাপদে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। কিন্তু এই ক্ষেত্রে গোমতী জেলা হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে আসার পরও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। পরিবর্তে হাসপাতাল চত্বরেই এক অ্যাম্বুলেন্স থেকে অন্য অ্যাম্বুলেন্সে রোগীকে স্থানান্তর করে পুনরায় আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়।
ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে আর কে পুর থানার পুলিশের কাছেও খবর পৌঁছায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখে বলে জানা যায়। তবে এই অ্যাম্বুলেন্স পরিবর্তনের পেছনে সঠিক কারণ কী, কার নির্দেশে এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে কোনো আর্থিক অনিয়ম জড়িত রয়েছে কি না—তা তদন্তের বিষয়।
অভিযোগের তীর ১০২ পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত দক্ষিণ জেলা ও গোমতী জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের দিকেও উঠেছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যাম্বুলেন্স চালকদের একাংশের বক্তব্য, এক-দুদিন কোনো অ্যাম্বুলেন্সে প্রযুক্তিগত সমস্যা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই অজুহাতে মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর একইভাবে এক অ্যাম্বুলেন্স থেকে অন্য অ্যাম্বুলেন্সে রোগী স্থানান্তর করে পরিষেবা দেওয়া হলে তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
স্বাস্থ্য পরিষেবা যেখানে একজন রোগীর জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি জড়িত, সেখানে অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবায় নিরাপত্তা, অক্সিজেনের ব্যবস্থা, জরুরি সরঞ্জাম এবং দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘কানেক্টিং অ্যাম্বুলেন্স’ ব্যবস্থার পেছনে আসল কারণ কী, এই ব্যবস্থার অনুমোদন রয়েছে কি না এবং এর ফলে রোগীদের কোনো ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে কি না—তা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠছে।
এখন দেখার বিষয়, বৃহস্পতিবার গভীর রাতের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসন বা স্বাস্থ্য দপ্তর কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ‘কানেক্টিং অ্যাম্বুলেন্স’ পরিষেবা নিয়ে ওঠা অভিযোগের আসল সত্য কোথায়—তা তদন্তে কতটা পরিষ্কার হয়।
Amarpur, Gomati | Aug 28, 2026