গোমতী জেলা হাসপাতালে চিকিৎসকদের অসাধ্য সাধন, ব্ল্যাক ক্রেইটের ছোবল থেকে প্রাণ বাঁচল গণ্ডাছড়ার যুবকের
উদয়পুর: গণ্ডাছড়ার নারিকেল বাগান এলাকার বাসিন্দা পত্যজয় চাকমার কাছে গত বৃহস্পতিবার ভোরটি নিয়ে এসেছিল চরম বিপদ। ভোর পাঁচটা নাগাদ নিজের বাড়িতেই তাকে একটি অত্যন্ত বিষধর 'ব্ল্যাক ক্রেইট' সাপ কামড় দেয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় গণ্ডাছড়া হাসপাতাল থেকে তাকে দ্রুত উদয়পুরের গোমতী জেলা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। দুপুর বারোটা নাগাদ সেখানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকদের তৎপরতায় কার্যত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন ওই যুবক। আজ সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়েছে।
গোমতী জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক ডাক্তার এন সি দাসের নেতৃত্বে শুরু হয় এই অদম্য লড়াই। ডক্টর দাস জানিয়েছেন, হাসপাতালে আনার পর রোগীর অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। সাপের বিষ ততক্ষণে সারা শরীরে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, রোগী নিজের চোখ বা মুখ খুলতে পারছিলেন না এবং তাঁর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বের হচ্ছিল। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রাও ছিল অনেক কম। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত অ্যান্টি-স্নেক ভেনাম প্রয়োগ শুরু করা হয়। প্রথম কুড়িটি ভেনাম দেওয়ার পর রোগীর অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হতে শুরু করে। মোট ত্রিশ ভায়াল অ্যান্টি-স্নেক ভেনাম এবং ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট ইনজেকশন প্রয়োগের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে তাঁর শ্বাসকষ্ট ও মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বের হওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এই অসাধ্য সাধনের পেছনে হাসপাতালের সম্পূর্ণ মেডিকেল টিমের এক অনবদ্য দলগত প্রচেষ্টা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডক্টর এন সি দাস। তিনি জানান, ইমার্জেন্সিতে রোগীকে প্রথম রিসিভ করেন ডক্টর প্রসেনজিৎ দাস, এবং সেই চরম উৎকণ্ঠার মুহূর্তে তৎপরতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন সিস্টার বুল্টি। এরপর রোগীকে আইসিইউ-তে স্থানান্তর করা হলে সেখানে ইনচার্জ শিপ্রা দিদিমণি এবং মীরা দিদি রোগীর সার্বক্ষণিক সেবায় আন্তরিকভাবে নিয়োজিত ছিলেন। পাশাপাশি, পিজিটি ডক্টর শুভরাজ চৌধুরী পুরোটা সময় ধরে এই চিকিৎসায় সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করেছেন।
এই জটিল চিকিৎসায় আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজ (এজিএমসি)-এর প্রফেসর ডক্টর অরুণাভ দাসগুপ্তের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি টেলিফোনের মাধ্যমে গোমতী জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রতিনিয়ত সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে সাহায্য করেছেন।
তবে চিকিৎসকদের এই অসামান্য সাফল্যের পেছনে রোগীর পরিবারের সচেতনতাও একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই চরম বিপদের মুহূর্তে কুসংস্কারের বশবর্তী না হয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁরা। মৃদুভাষী হলেও পত্যজয়ের ছেলে সনাতন চাকমা জানান, সাপে কামড় দেওয়ার পর তাঁরা কোনো ওঝার কাছে না গিয়ে সোজা গণ্ডাছড়া হাসপাতালে ছুটে যান। হাসপাতালের চিকিৎসার উপর আস্থা রেখে গেছেন। হাসপাতালের পরিষেবা এবং চিকিৎসকদের আন্তরিকতায় তাঁরা অত্যন্ত খুশি। পত্যজয়ের সঙ্গে হাসপাতালে আসা তাঁর আত্মীয় দেবজয় চাকমা জানান, এই দীর্ঘ ও জটিল চিকিৎসাটি তাঁরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেয়েছেন। ব্ল্যাক ক্রেইট সাপের বিষ অত্যন্ত মারাত্মক হওয়া সত্ত্বেও সঠিক সময়ের চিকিৎসায় আজ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন পত্যজয়। সম্পূর্ণ সুস্থ পত্যজয়কে নিয়ে এখন তাঁদের শুধুই বাড়ি ফেরার আনন্দময় প্রস্তুতি।
Amarpur, Gomati | Sep 26, 2026