
রেলের মানবিক মুখ! শিশুর দুধ ফুরোতেই রুট বদলানো ট্রেন থামানো হলো নৈহাটিতে, প্রশংসায় পঞ্চমুখ যাত্রীরা
সংবাদ প্রতিবেদন:
কলকাতা:
কথায় আছে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। সেই আপ্তবাক্যকেই ফের একবার বাস্তবে প্রমাণ করল ভারতীয় রেল। নির্ধারিত কোনো স্টপেজ বা সময়সূচি না থাকা সত্ত্বেও, এক খিদেকাতুরে শিশুর মুখের দুধের জোগান দিতে মাঝপথে ইমার্জেন্সি সিগন্যাল দিয়ে ট্রেন থামিয়ে এক অনন্য মানবিকতার নজির গড়ল রেল প্রশাসন। রেলের এই তড়িৎ তৎপরতা ও সংবেদনশীলতাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ট্রেনের যাত্রীরা।
সূত্রের খবর, উত্তরবঙ্গ থেকে শিয়ালদহগামী মর্যাদাপূর্ণ দার্জিলিং মেল (হালদিবাড়ি-শিয়ালদহ) নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করে চলছিল। ফরাক্কা বা মালদহের কাছাকাছি রেলপথে বিপর্যয় ও ধসের জেরে ট্রেনটিকে বিকল্প রুটে ঘোরানো হয়। এর জেরে ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় ৮ ঘণ্টা দেরিতে চলছিল। ওই ট্রেনের এ২ (A2) কোচে ৩৫ নম্বর বার্থে এক মহিলা তাঁর একরত্তি সন্তানকে নিয়ে কিশনগঞ্জ থেকে শিয়ালদহের দিকে যাত্রা করছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পনা ছিল যাত্রাপথে মালদহের পরের কোনো একটি স্টেশনে আত্মীয়ের মাধ্যমে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় দুধ সংগ্রহ করে নেওয়া হবে। কিন্তু ট্রেনটির রুট পরিবর্তন হওয়ায় সেই পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। দীর্ঘক্ষণ ট্রেন দেরিতে চলার কারণে একসময় শিশুটির সঙ্গে থাকা সমস্ত দুধ ফুরিয়ে যায়। অন্যদিকে তীব্র ক্ষিদেয় কান্নাকাটি শুরু করে দেয় শিশুটি। চরম অসহায় পরিস্থিতিতে পড়ে যান ওই শিশুটির মা।
উপায় না দেখে ট্রেন থেকেই উত্তরপ্রদেশে থাকা তাঁর স্বামী আজগর আলিকে পুরো বিষয়টি ফোন করে জানান ওই মহিলা। কালবিলম্ব না করে বিপদের কথা মাথায় রেখে আজগর আলি তৎক্ষণাৎ ভারতীয় রেলের জরুরি সহায়তা অ্যাপ ‘Rail Madad’-এ যোগাযোগ করেন এবং সমস্ত পরিস্থিতি জানিয়ে শিশুর জন্য জরুরি ভিত্তিতে দুধের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান।
অভিযোগটি পোর্টালে আসামাত্রই তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে শিয়ালদহের কমার্শিয়াল কন্ট্রোল বিভাগ। বিষয়টি দ্রুত ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার (DRM)-এর নজরে আনা হয়। প্রথমে ব্যান্ডেল স্টেশনে ট্রেন থামিয়ে খোঁজ চালানোর চেষ্টা হলেও ভিড় ও সময়ের ব্যবধানে মহিলার নাগাল পাওয়া যায়নি। এরপর পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে নৈহাটি স্টেশনে ট্রেনটির কোনো রুটিন স্টপেজ না থাকা সত্ত্বেও জরুরি সিগন্যাল (Emergency Signal) দিয়ে ট্রেনটিকে থামানোর সিদ্ধান্ত নেন রেলকর্তৃপক্ষ।
নৈহাটি স্টেশনে ট্রেন থামতেই তৎপর হয়ে ওঠেন রেলকর্মীরা। তাঁরা নির্দিষ্ট কোচে গিয়ে ওই মায়ের খোঁজ নেন এবং তাঁর হাতে গরম দুধের বোতল তুলে দেন। রেলের এই আকস্মিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপে স্বস্তি ফেরে পরিবারে, খিদের চোটে কান্না থামে ছোট্ট শিশুটিরও।
পরবর্তীকালে শিশুটির বাবা আজগর আলি এবং ট্রেনের সহযাত্রীরা রেল প্রশাসনের এই মানবিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। যাত্রীদের মতে, বাণিজ্যিক ব্যস্ততার ভিড়ে রেলের এই ধরনের মানবিক ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার মানসিকতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। সমস্ত প্রতিকূলতা ও ৮ ঘণ্টার দীর্ঘ বিলম্ব কাটিয়ে অবশেষে ওই দিন দুপুর ১টা ৪৩ মিনিট নাগাদ দার্জিলিং মেল শিয়ালদহ স্টেশনে এসে পৌঁছয়।