
চলে গেল বাস্তবের ‘মোগলি গার্ল’ এহসাস, রয়ে গেল এক রহস্যময় জীবনের গল্প
২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশের কাতারনিয়াঘাটের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া ‘মোগলি গার্ল’ এহসাস আর নেই। দীর্ঘ নয় বছরের পুনর্বাসন, চিকিৎসা এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সংগ্রামের শেষে ২০২৬ সালের জুন মাসে ফুসফুসের সংক্রমণ ও সেপ্টিসেমিয়ায় মৃত্যু হয়েছে তার। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে কাতারনিয়াঘাট বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যের ঘন অরণ্যে বনকর্মীরা প্রথম দেখতে পান এহসাসকে। সে চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে চলাফেরা করত, মানুষের ভাষা বুঝত না, পোশাক পরতে চাইত না এবং বিভিন্ন অদ্ভুত শব্দ করে যোগাযোগের চেষ্টা করত। স্থানীয়দের দাবি ছিল, তাকে প্রায়ই বাঁদরদের সঙ্গে দেখা যেত। এরপরই সংবাদমাধ্যমে সে পরিচিতি পায় ‘মোগলি গার্ল’ নামে।
উদ্ধারের পর তাকে লখনউয়ের সরকারি বিশেষ শিশু নিবাসে রাখা হয়। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে জানা যায়, তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই কম ছিল এবং সে মৃগীরোগসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিল। প্রথমদিকে মেঝে থেকে খাবার তুলে খাওয়া, মানুষের স্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং সামাজিক আচরণ না বোঝাই ছিল তার স্বাভাবিক অভ্যাস।
তবে নিবাসের কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে বদল আসে এহসাসের জীবনে। সে গ্লাসে জল পান করতে শেখে, থালায় খাবার খেতে শুরু করে, পোশাক পরে থাকতে অভ্যস্ত হয় এবং আশপাশের মানুষদের চিনতে শেখে। পরিচর্যাকারী রানি দেবীর সঙ্গে তার বিশেষ স্নেহের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একসময় এহসাস তাকে ‘আম্মা’ বলে ডাকতে শুরু করেছিল, যা সকলকেই আবেগাপ্লুত করেছিল।
তবে এহসাসকে ঘিরে সবচেয়ে বড় রহস্যের সমাধান কখনও হয়নি। সে সত্যিই কি বাঁদরদের সঙ্গে বড় হয়েছিল, নাকি অন্য কোথাও থেকে হারিয়ে জঙ্গলে এসে পড়েছিল—তার কোনও নির্দিষ্ট উত্তর আজও মেলেনি। বিভিন্ন সময়ে পরিবারের দাবি উঠলেও তার পক্ষে কোনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গত ৮ জুন শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে লখনউয়ের ডক্টর রাম মনোহর লোহিয়া চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে ফিরলেও ১৫ জুন ফের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ফুসফুসের গুরুতর সংক্রমণ থেকে সৃষ্ট সেপ্টিসেমিয়াকেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া এক রহস্যময় কিশোরীর জীবনের শেষ অধ্যায় এখানেই শেষ হলেও, এহসাসের গল্প আজও মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়। একই সঙ্গে তার জীবন প্রমাণ করে, ভালোবাসা, ধৈর্য ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে কতটা বদলে যেতে পারে একজন মানুষের জীবন।